নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক সময় চটকদার প্রচারণার ভিড়ে হারিয়ে যায় প্রকৃত ত্যাগীদের গল্প। কিন্তু কিছু নাম থাকে যারা সময়ের স্রোতে গা না ভাসিয়ে রাজপথের ধুলোবালিতে নিজেদের আদর্শকে সজীব রাখেন। হালিমা খান লুসি তেমনই এক নাম। ১৯৯২ সাল থেকে আজ অবধি সুদীর্ঘ ৩৩ বছরের এক অবিচল সংগ্রামের নাম।
ভিত্তি যখন আদর্শ: কুমুদিনী থেকে ঢাবি
হালিমা খান লুসির রাজনীতির হাতেখড়ি টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী কুমুদিনী কলেজে। শহীদ জিয়ার জাতীয়তাবাদী দর্শনে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রদলের পতাকাতলে যুক্ত হওয়া সেই তরুণী আজ বিএনপির রাজনীতির এক অপরিহার্য মুখ। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (দর্শন বিভাগ) উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। শামসুন্নাহার হলের সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহ-মহিলা সম্পাদক হিসেবে তার বজ্রকণ্ঠ রাজপথ কাঁপিয়েছে বারবার।

১/১১ এবং স্বৈরশাসন বিরোধী লড়াই: মানবিক নেত্রী
রাজনীতিবিদদের প্রকৃত পরীক্ষা হয় দলের দুঃসময়ে। ১/১১ পরবর্তী অন্ধকার সময়ে যখন অনেক বড় নেতাও আড়ালে ছিলেন, তখন হালিমা খান লুসি ছিলেন রাজপথে অকুতোভয়। গুলশানে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয় যখন বালুর ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়েছিল, তখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিবাদী অবস্থানে থাকা গুটিকয়েক কর্মীর মধ্যে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। গত ১৭ বছরের দীর্ঘ লড়াই এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব—প্রতিটি মোড়ে তিনি ছিলেন অটল। জেল-জুলুম আর হামলা-মামলা তাকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
মেধার রাজনীতি ও নির্বাচনী কৌশল
হালিমা খান লুসি কেবল একজন মাঠের কর্মী নন, তিনি মেধাভিত্তিক রাজনীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে তিনি এমবিএ এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে আইনজীবী হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই নেত্রী রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়েছেন আধুনিক নির্বাচনী কৌশলে।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা উপকমিটির সদস্য হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে ঢাকা-১৭ এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকা হিসেবে পরিচিত অত্যন্ত কঠিন এলাকাগুলোতে ৫টি জেলার ২০টি সংসদীয় আসনে পোলিং এজেন্টদের প্রশিক্ষণ ও নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি ছিলেন নেপথ্য কারিগর। তার প্রশিক্ষিত এজেন্টরাই ভোটের মাঠে সাহসিকতার সাথে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করেছেন।
কেন সংরক্ষিত নারী আসনে হালিমা খান লুসি?
বর্তমানে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লুসি কাজ করছেন তৃণমূলের অবহেলিত মানুষের জন্য। তার স্বপ্ন—দেশের জিডিপিতে যে ৫০ ভাগ নারী শ্রমিকের অবদান আছে, তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সংরক্ষিত নারী আসনে হালিমা খান লুসির মতো একজন শিক্ষিত, আইনজীবী ব্যাকগ্রাউন্ডের এবং রাজপথের পরীক্ষিত নেত্রীকে মনোনয়ন দেওয়া এখন সময়ের দাবি। তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মনে করেন, লুসির মতো ত্যাগীদের মূল্যায়ন করলে তা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং রাজপথের প্রতিটি ত্যাগী কর্মীকে সম্মানিত করবে।

৩৩ বছরের ত্যাগের পর হালিমা খান লুসি আজ কেবল একজন নেত্রী নন, তিনি রাজপথের এক জীবন্ত ইতিহাস। মেধা, সাহস আর দলীয় আনুগত্যের এই বিরল সমন্বয় তাকে পৌঁছে দিয়েছে তৃণমূলের আস্থার শীর্ষে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নতুন বাংলাদেশে হালিমা খান লুসির মতো নেত্রীদের সংসদে থাকা কেবল দলের জন্য নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সুস্থ ধারার রাজনীতি চর্চার জন্যও একান্ত প্রয়োজন।




