আজ ২০ জানুয়ারি, ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় আজ একটি বিশেষ দিন, কারণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় আজই।
ঠিক ২২ দিন পর, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কোটি কোটি ভোটারের রায়ে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর পরবর্তী রূপরেখা।
২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন, যা কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং একই সাথে একটি ঐতিহাসিক ‘গণভোট’ (Referendum)-ও বটে। নির্বাচনী প্রচারণার বাঁশি বাজার ঠিক আগ মুহূর্তে আজ রাজনীতির মাঠ কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, তা নিয়েই আমাদের আজকের বিশেষ বিশ্লেষণ।
১. আজই চূড়ান্ত লড়াইয়ের রেখাচিত্র
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফশিল অনুযায়ী, আজ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। আগামীকাল ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর ২২ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা।
সারা দেশে ৩০০০-এর বেশি প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, যার মধ্যে বাছাই শেষে প্রায় ১৮৫০ জনের মতো টিকে আছেন। আজকের পর জানা যাবে শেষ পর্যন্ত কয়টি আসনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং অন্যান্য দলগুলো মুখোমুখি লড়াই করছে।
২. নির্বাচন ও গণভোট: এক টিকেটে দুই আয়োজন
১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের দিন কেবল এমপি নির্বাচন নয়, ভোটাররা ব্যালট পেপারে আরেকটি বিশেষ অংশ পাবেন—’জুলাই সনদ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রস্তাবনার পক্ষে-বিপক্ষে হ্যাঁ/না ভোট।
- মূল সংস্কারগুলো: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা, উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা।
- বর্তমান প্রেক্ষাপট: প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিই হবে এবং এটি কোনো পাতানো নির্বাচন হবে না।” সরকারের পক্ষ থেকে ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে সংস্কারের ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
৩. নতুন শক্তির উত্থান ও জামায়াতের ‘পলিসি সামিট’
আজ ২০ জানুয়ারি সকালে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর ‘পলিসি সামিট-২০২৬’। সেখানে আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করেছেন, তারা বিভাজনের রাজনীতি নয় বরং ঐক্যের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়তে চান।
অন্যদিকে, জুলাই বিপ্লবের ফসল ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ (NCP) প্রথমবারের মতো ব্যালট যুদ্ধের ময়দানে নামছে। প্রথাগত বড় দলগুলোর জন্য এই নতুন শক্তির জনপ্রিয়তা এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
৪. নির্বাচনী নিরাপত্তা ও ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’
নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে। গত কয়েক দিনে দেশজুড়ে প্রায় ৫৩ হাজার তালিকাভুক্ত অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং বিজিবি মাঠে কাজ করছে। এমনকি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের যাতায়াত সহজ করতে অন-অ্যারাইভাল ভিসার নিষেধাজ্ঞাও তুলে নিয়েছে সরকার।
৫. ২০২৬ নির্বাচনের ট্রাম্প কার্ড: তরুণ ভোটার
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ নতুন এবং তরুণ ভোটার। যারা কোনো দলীয় ট্যাগ ছাড়া স্রেফ সুশাসন এবং কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেখে ভোট দেবেন।
বিশেষ করে বেকারত্ব এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে যারা সুনির্দিষ্ট সমাধান দিতে পারবে, তরুণদের পাল্লা সেদিকেই ভারী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
উপসংহার আগামীকাল থেকে যখন মাইকের শব্দ আর পোস্টারে ছেয়ে যাবে রাজপথ, তখন শুরু হবে রাজনীতির আসল খেলা। ১৭ বছরের রাজনৈতিক অচলায়তনের পর এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক উৎসবের নাম।
তবে এই উৎসবের সার্থকতা তখনই হবে, যখন ১২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রগুলোতে কোনো কারচুপি ছাড়া জনগণ তাদের রায় দিতে পারবে। রাজনীতির মোড় কোন দিকে ঘোরে, তা দেখতে আমাদের চোখ থাকবে ‘রাজনীতি বাংলা ডট কম’-এর পাতায়।




