চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার ছিল, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে তা এখন এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্নের মুখে।
৫ আগস্টের শহীদের রক্ত কোনো নির্দিষ্ট দলের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি ছিল না। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বলছে—দৃশ্যপট বদলালেও নাটকের স্ক্রিপ্ট রয়ে গেছে সেই পুরনোই। নির্বাচন
প্রশাসনের ‘দলীয় ঝোঁক’ ও জামায়াতের শঙ্কা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে যে অভিযোগ তুলেছে, তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। দলটির দাবি, মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষতা হারিয়ে ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকছে। নির্বাচনের ময়দানে যখন আমলাতন্ত্র কোনো দলের আজ্ঞাবহ হয়ে কাজ করে, তখন ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ কেবল শব্দেই সীমাবদ্ধ থাকে। ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পরও যদি প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দলীয় আনুগত্য কাজ করে, তবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল একটি অলীক কল্পনা।
নির্বাচন কমিশনের ‘পক্ষপাত’ ও আসিফ মাহমুদের বিস্ফোরণ
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নির্বাচন কমিশনের (ইসি) স্বচ্ছতা নিয়ে যে বোমা ফাটিয়েছেন, তা সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ইসির বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই ইসির অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়া এখন পুনর্বিবেচনার বিষয়।
আসিফ মাহমুদের অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর—আপিল শুনানির শেষ দিনে বিচারক (কমিশনার) কেন অভিযুক্ত বা নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সাথে দেড় ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করবেন? এই ‘গোপন বৈঠক’ কি কোনো পাতানো নির্বাচনের নীল নকশা? ছাত্রদলের ‘মব’ সৃষ্টি করে কমিশন ঘেরাওকে তিনি ‘নাটক’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এটি দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক চরম অশনি সংকেত।
আরও পড়ুন- রুমিন ফারহানার হুঁশিয়ারি
বিএনপির এক বছর: সাধারণ মানুষের চোখে ‘নতুন দখলদারি’ নির্বাচন
সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চিত্র। আওয়ামী লীগের পতনের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাজনৈতিক শিষ্টাচার ফিরবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতা ভোগের আগেই বিএনপির একাংশ সারা দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের হয়ে কাজ করার মহোৎসবে মেতে উঠেছে।
নির্বাচন। গণমাধ্যমের ভাষ্য: চাঁদাবাজি থেকে খুনের রাজনীতি
গত এক বছরে দেশের প্রথম সারির জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিএনপির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে একের পর এক নেতিবাচক সংবাদ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত দখলদারিত্বের মচ্ছব চলছে। বিশেষ করে সাভার, চট্টগ্রাম ও খুলনায় ব্যবসায়ীদের ওপর হামলা এবং কোটি টাকা চাঁদাবাজির অসংখ্য খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, কেবল চাঁদাবাজিই নয়, অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক খুনের ঘটনার সাথেও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পুলিশের খাতায় চিহ্নিত দাগি সন্ত্রাসীরা বিএনপির ছত্রছায়ায় এলাকায় ফিরছে এবং পুরনো দিনের মতো ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে। পত্রিকার পাতায় এসব শিরোনাম দেখে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলছে—৫ আগস্টের বিপ্লব কি তবে কেবল একদল সন্ত্রাসীর পরিবর্তে আরেকদল সন্ত্রাসীকে পুনর্বাসিত করার জন্য ছিল?
গত ১ বছরে সাধারণ মানুষ বিএনপির এসব অনিয়ম খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছে। দখলবাজি ও চাঁদাবাজির যে রাজত্ব আগে ছিল, অনেক ক্ষেত্রে কেবল ‘ব্যানার’ ও ‘মালিক’ পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করছে ভুক্তভোগী জনতা। বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা এই সন্ত্রাস ও অনিয়মের অভিযোগ নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনে এক গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে।
রুমিন ফারহানার হুঙ্কার: ৫ আগস্টের পুনরাবৃত্তি কি আসন্ন? নির্বাচন
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নির্বাচনের নিরপেক্ষতা না থাকলে প্রতিটি আসনেই ‘৫ আগস্ট’ হতে পারে। এই মন্তব্যটি রাজনৈতিক মহলে গভীর ভাবনার উদ্রেক করেছে। একদিকে ইসির ওপর অনাস্থা, অন্যদিকে মাঠ পর্যায়ে রাজনৈতিক দলের পেশিশক্তির আস্ফালন—সব মিলিয়ে মানুষ এখন দিশেহারা। যদি ভোটের মাধ্যমে মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন না ঘটে, তবে আবারো রাজপথের বিদ্রোহ যে অনিবার্য, রুমিন ফারহানা মূলত সেই ধ্রুব সত্যটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন।
উপসংহার: সময় থাকতে সাবধান হওয়া জরুরি
বিচারক যখন রায়ের আগে অভিযুক্ত পক্ষের সাথে দেড় ঘণ্টা আলাপ করেন, তখন সেই রায় নিরপেক্ষ হওয়ার সুযোগ থাকে না—এনসিপির এই অভিযোগটিই বর্তমান নির্বাচনের মূল চিত্র ফুটিয়ে তুলছে। একদিকে প্রশাসনের দলীয়করণ, অন্যদিকে বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ২০২৬-এর নির্বাচন এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।
জনগণ আর কোনো ‘মঞ্চস্থ নাটক’ দেখতে চায় না। ৫ আগস্টের চেতনাকে ধারণ করে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা এখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন ও কমিশনকে প্রমাণ করতে হবে তারা কোনো দলের সেবক নয়, বরং রাষ্ট্রের সেবক। অন্যথায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি রুখা কারোর পক্ষেই সম্ভব হবে না।
— মোহাম্মদ মহসীন, প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক


