ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র ও কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার: জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহারের বিস্তারিত

জামায়াতের নির্বাচনী ইশতেহার

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান এই ইশতেহার তুলে ধরেন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের জন্য যুগান্তকারী পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে এই ইশতেহারে।

নারীর কর্মঘণ্টা ৩ ঘণ্টা কমানোর ব্যাখ্যা

ইশতেহারে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর প্রস্তাব। জামায়াত জানায়, ক্ষমতায় গেলে মাতৃত্বকালীন সময়ে মায়েদের সম্মতি সাপেক্ষে তাদের দৈনিক কর্মঘণ্টা ৫ ঘণ্টায় (অর্থাৎ ৩ ঘণ্টা হ্রাস) নামিয়ে আনা হবে।

দলটির আমির স্পষ্ট করেন যে, এটি নারীদের চাকরি থেকে দূরে রাখার জন্য নয়, বরং সন্তান ও পরিবারের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি যেন তারা ক্যারিয়ার ধরে রাখতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই এই শিথিলতা। এর মাধ্যমে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় দলটি।

আরো জানুন- জামায়াতের বৈপ্লবিক ইশতেহার: ৫টি ‘হ্যাঁ’ আর ৫টি ‘না’-তে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা

রাষ্ট্র পরিচালনায় ২৬ দফা অগ্রাধিকার

জামায়াত তাদের ইশতেহারে ২৬টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো:

  • সুপারিশকৃত নির্বাচন পদ্ধতি: সমানুপাতিক (PR) নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
  • জুলাই বিপ্লবের স্বীকৃতি: জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিশ্চিত করা।
  • দুর্নীতি ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ: প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত ও আধিপত্যবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়া।
  • আঞ্চলিক যোগাযোগ: রাজধানী থেকে সকল বিভাগীয় শহরের দূরত্ব সড়ক বা রেলপথে ২-৩ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবাকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা রেখেছে দলটি:

শিক্ষা সেক্টর:

  • বাজেট বৃদ্ধি: শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ৬% করা হবে।
  • নারী শিক্ষা: স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ।
  • মাদ্রাসা শিক্ষা: ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মর্যাদা প্রদান।
  • উচ্চশিক্ষা ঋণ: ১ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে মাসে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ।

স্বাস্থ্য সেক্টর:

  • বিনামূল্যে চিকিৎসা: ৫ বছরের নিচে এবং ৬০ বছরের ঊর্ধ্বের সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা।
  • মেডিকেল কলেজ: দেশের ৬৪টি জেলাতেই সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা।
  • বাজেট: স্বাস্থ্যখাতের বাজেট পর্যায়ক্রমে ৩ গুণ বৃদ্ধি করা।

আমির শফিকুর রহমানের মূল বক্তব্য: “আমরা বেকারভাতা নয়, যুবকদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। একজন চা শ্রমিকের সন্তানও যেন এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে, আমরা তেমন ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ব।”

কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

বেকারত্ব দূর করতে জামায়াতে ইসলামী সাত কোটি কর্মক্ষম যুবকের জন্য দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের রোডম্যাপ তৈরি করেছে।

  1. বিদেশে কর্মসংস্থান: কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সরকারি ঋণের মাধ্যমে ৫০ লাখ যুবকের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ।
  2. সরকারি চাকরি: চাকরিতে আবেদনের জন্য বিদ্যমান পরীক্ষা ফি বাতিল করা হবে।
  3. ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ: বেসরকারি শিল্প মালিকদের বিশেষ যত্ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ব্যাপক বিকাশ।

উপসংহার

জামায়াতে ইসলামীর এবারের ইশতেহার মূলত ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু বৈষম্য দূর করে ‘নাগরিক পরিচয়’কে প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *